বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট দিয়ে যেসকল সুবিধা পাওয়া যাবেঃ

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ (BANGABONDHU-1) বাংলাদেশের প্রথম ভূস্থির যোগাযোগ উপগ্রহ। এটি ১১ মে ২০১৮ ইডিটি, বাংলাদেশ মান সময় ১২ মে ভোর ০২:১৪ তে কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়। এই প্রকল্পটি ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন কর্তৃক বাস্তবায়িত হয় এবং এটি ফ্যালকন ৯ ব্লক ৫ রকেটের প্রথম পেলোড উৎক্ষেপণ ছিল। আজ থেকে প্রায় ১৮ বছর আগে মহাকাশে নিজেদের কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানোর স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিল বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের কিছু সুবিধাসমূহঃ
বাংলাদেশে এই মুহূর্তে টিভি চ্যানেল আছে প্রায় ৪৫ টি। ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বা আই এস পি আছে কয়েকশ। রেডিও স্টেশন আছে পনের টি এর উপরে। আরও আসছে। তাছাড়া ভি-স্যাট সার্ভিস তো আছেই। এমনি আরো অনেক কারনেই বাংলাদেশে স্যাটেলাইটের ব্যাবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিটিআরসির হিসাবে,প্রতিটি টিভি চ্যানেল স্যাটেলাইটের ভাড়া বাবদ প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ ডলার দিয়ে থাকে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট চালু করতে পারলে দেশে শুধু বৈদেশিক মুদ্রারই সাশ্রয় হবে না, সেই সাথে অব্যবহৃত অংশ নেপাল, ভূটান এর মতো দেশে ভাড়া দিয়ে প্রতি বছর প্রায় ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থ আয় করা যাবে। কারণ ৪০ টি ট্রান্সপন্ডারের মধ্যে মাত্র ২০ টি ব্যবহার করবে বাংলাদেশ। আর বাকি ২০ টি ভাড়া দেওয়া হবে। আমাদের দেশের টাকা এবং কষ্টার্জিত মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। অনেক সময় টাকা পাচার বা মানি লন্ডারিং এর মত গুরুতরো অভিযোগ ও আছে এই খাতে। বাংলাদেশের নিজস্ব উপগ্রহ চালু হলে ভাড়া বাবদ অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।

প্রধানত নিম্নলিখিত যেসব কারণে স্যাটেলাইট এর ব্যবহারঃ

১। মহাকাশ বা জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণা

২। আবহাওয়ার পূর্বাভাস

৩। টিভি বা রেডিও চ্যানেল, ফোন, মোবাইল ও ইন্টারনেট যোগাযোগ প্রযুক্তি

৪। নেভিগেশন বা জাহাজের ক্ষেত্রে দিক নির্দেশনায়

৫। পরিদর্শন– পরিক্রমা (সামরিক ক্ষেত্রে শত্রুর অবস্থান জানার জন্য)

৬। দূর সংবেদনশীল

৭। মাটি বা পানির নিচে অনুসন্ধান ও উদ্ধার কাজে

৮। মহাশূন্য এক্সপ্লোরেশন

৯। ছবি তোলার কাজে (সরকারের জন্য এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ)

১০। হারিকেন, ঘূর্ণিঝড়, প্রাকৃতিক বিপর্যয় এর পূর্বাভাস

১১। আজকাল সন্ত্রাসীরা অনেক রিমোট এরিয়া তেও স্যাটেলাইট ফোন ব্যবহার করছে।

১২। গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা জি পি এস

১৩। গামা রে বারস্ট ডিটেকশন করতে

১৪। পারমাণবিক বিস্ফোরণ এবং আসন্ন হামলা ছাড়াও স্থল সেনাবাহিনী এবং অন্যান্য ইন্টিলিজেন্স সম্পর্কে আগাম সতর্কবার্তা পেতে।

১৫। তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিভিন্ন খনির সনাক্তকরণ ইত্যাদি

১৬। ডিজিটাল ম্যাপ তৈরি করা

উপরের বিভিন্ন কাজের জন্য অবশ্য বিভিন্ন আলাদা রকমের স্যাটেলাইট ব্যবহার করা হয়। একটি স্যাটেলাইট দিয়েই সব কাজ হয় না। তথাপি আমাদের মত গরিব দেশের জন্য টিভি চ্যানেল আর ইন্টারনেট ব্যবহারে খরচটা সাশ্রয় করতে পারাও কম না।

আশা করা যায় যে মাত্র তিন থেকে ছয় বছরেই এই স্যাটেলাইট পাঠানোর সকল খরচ উঠে আসবে। বাংলাদেশ সরকার বঙ্গবন্ধু-১ নামে একটি স্যাটেলাইট উপগ্রহ পাঠানোর কাজ অনেক আগেই শুরু করেছে। এর জন্য ৮৫ কোটি টাকা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষজ্ঞ কোম্পানিকে প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল।

এই মুহূর্তে বিশ্বের ৫৭ টি দেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট আছে।

বাংলাদেশসহ ২৪ টি দেশ নিজস্ব স্যাটেলাইট পাঠানোর চেষ্টা করছে। এখানে উল্লেখ্য যে, ভারত ১৯৭৫ সালে Aryabhata নামের উপগ্রহ পাঠায়। আর পাকিস্থান ১৯৯০ সালে Badr-1 নামের উপগ্রহ পাঠায়। বর্তমানে এই দুইটি দেশের একাধিক উপগ্রহ আছে।

এমনকি ভিয়েতনাম, ইন্দনেশিয়া, থাইল্যান্ড, নাইজেরিয়া, ফিলিপাইন, কলম্বিয়া, মউরিতানীয়া, কাযাগাস্তান এর ও নিজস্ব উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট আছে। আরও আশ্চর্যের বিষয় হল- শ্রীলংকা, আফগানিস্তান, উত্তর কোরিয়ার মত দেশও নিজস্ব স্যাটেলাইট পাঠাচ্ছে।

সমগ্র পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা কেন পিছিয়ে থাকবো? কিন্তু অতিব দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের ২০ টিরও বেশী দেশ আমাদের স্যাটেলাইট স্থাপনের সম্ভাব্য অবস্থান(মহাকাশে নির্ধারিত স্থান) নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপন: ২০১৩ সালে প্রথম বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ‍উৎক্ষেপনের কথা থাকলে বিভিন্ন কারণে এটি পেছাতে পেছাতে ২০১৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর তারিখ নির্ধারণ হয়, এরপর পুনরায় ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারী, এরপর মার্চ মাসে উৎক্ষেপণ করার কথা থাকলেও অবশেষে এটি ১১ মে ২০১৮ ইডিটি, বাংলাদেশ মান সময় ১২ মে ভোর ০২:১৪ তে কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়।

 

মন্তব্য করুন